‘নৈঃশব্দ্য নাকি কোলাহল ’
কিছু দিন হলো ইউনিভার্সিটি শেষ হয়েছে , এখন সবটা এই ঘরেই । একটা জীবন যেন শেষ হয়ে গেল , তবে যে এতো দিনের অ্যাকাডেমিক দৌড়ের পরে স্বস্তি পেলাম তেমন নয় , দুদন্ডের বিশ্রামের কথা যেই ভেবেছি তার মধ্যেই হানা দিতে শুরু করেছে পরবর্তী জীবন ও তাকে ঘিরে সহস্র চিন্তাভাবনা । কি হবে , কি করবো এমন সহস্র ভাবনা। হ্যাঁ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে তবে তাছাড়াও তো একটা অনিশ্চয়তা ছুঁয়েই যায় , যদি কিছু না হয় , যদি কিছু না করতে পারি ইত্যাদি ইত্যাদি । আর এসবের মধ্যে এই চারটে চার রঙের দেওয়াল ,ও তার বহু বছরের স্মৃতি কেমন কানের পাশে নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে ।এই ঘরেই তো মা ছোটবেলায় গরাস করে করে খাইয়ে দিতো , বাবা কাজ থেকে দুপুরে খেতে ফিরতো , আর আমি খাবার মুখে ঘরময় ঘুরতাম । আর এখন বসে আছি সেই ঘরেই , আর ভাবছি ভবিষ্যতে সেই খাবারের সংস্থান করবো কিভাবে , ঘরের জানলা ও তার পাশেই লতিয়ে ওঠা ওই অপরাজিতা গাছ । মায়ের মতো মনে হয় ওটিকে । আমার ছোট্ট মা রান্না ঘরে চা করতে করতে গুনগুন করছে শুনতে পাচ্ছি । বিকেল পড়ে এলো । বাইরে বাগানের দিকে তাকাই আকাশের গুমোট অন্ধকার দেখে মন আর ঘরে টেকে না , মনে হয় বেরিয়ে আসি । ওপার থেকে শব্দ আসে ‘ চা হয়ে গেছে খেয়ে নে , তুই একটু ঘুমালি না ?’ এইটুকু শুনে মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকি , আর ভাবি , তার ও তো ঘুমের প্রয়োজন ।চা দিয়ে নিজের মতো কাজ করতে থাকে সে, আমাকে বকতে থাকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, আমি চুমুক দিই , দুধ আর চায়ের মাখা গন্ধ আর তার মধ্যে এলাচের মৃদু সুর ঠোঁটে নিয়ে রেডি হতে যাই । পকেট ভর্তি খুচরো চিন্তা-ভাবনার ভিড়ে কেবল ভরে থাকে মায়ের গুনগুন সেই গান । মাঝে মধ্যে মনে হয় গানটা শিখতেই পারতো ।
একটা সাংসাং শব্দ উপরে, প্লেন উড়ে যাচ্ছে । আমি হাঁটছি । অটো ধরবো । রাস্তায় মাথায় ঝুলছে ল্যামপোস্টের তার , আর পাশে সব বিল্ডিঙের সারিরা । মাঝে মধ্যে মনেই হয় এই শহরে মধ্যে যেন নিঃশ্বাস ফেলার ও জায়গা নেই , মানুষ যে একটু চুপচাপ নিরিবিলি হয়ে থাকবে চারটে কবিতার পড়বে বা কিছু বিষয় নিয়ে একটা আদুরে আড্ডায় জমিয়ে তুলবে তার সময়কে , গুছিয়ে রাখবে জীবন থেকে পাওয়া একটুকরো আনন্দকে , এ শহর যেন সেটুকুরো সময় ও কেড়ে নেবে , তবু নেবে বললেই কি নিয়ে নিতে পারে ? এতটাই সহজ ? যে শৈশবের আজ কেবল স্মৃতির মধ্যে রয়েছে তার ‘বস্তুভিত্তি’ সমস্তটা প্রায় ধ্বংস আজ ,আর সেই ধ্বংসের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে ইচ্ছা করে তা ,এখনো বেঁচে আছে আমার মধ্যে ।শহরের কোনায় কোনায় এখনো অনেক ছোট ছোট ফাঁকফোকর রয়ে গেছে যেখানে পরিজায়ী পাখিদের প্রাণ কাজে অকাজে , দিনেদুপুরে যখন তখন নিজেদের নৈঃশব্দ্য কে খুঁজে নেয় । তেমনি এক জায়গায় যাচ্ছি । এসবের মধ্যে বলাই হলো না ওই যে প্লেনটা উড়ে গেল তা কেমন যেন ভাবায় , কে জানে কোথায় গেল , আমার প্লেন চড়ার একটা শখ ছিল বরাবরই , তবে এখন ভয় করে মনে হয় , যে শহরের বুকে নৈঃশব্দ্যের খোঁজ করা , তার কোলাহল যদি হারাই তাহলে হয়তো সমূহ যাবে । এই কোলাহলের জন্যেই তো নৈঃশব্দ্যের মূল্য ।
অটো থেকে নামলাম বালিগঞ্জ। টাকা মিটিয়ে খুচরো নিয়ে আবার হাটা , এই তো । আমাদের নৈঃশব্দ্যে কাছে পৌঁছাতে হলেও অনেক অনেক হাঁটতে হয় । রাস্তা পার হয়ে যাই ট্রামলাইন গুলো তাকিয়ে থাকে , অঝোর বর্ষনে যে জল জমে এ রাস্তার ধারে এখনো তার দাগ রয়ে গেছে , কিছু কিছু জায়গায় এখনো জল জমে । আর এই ভেজা ফুটপাতেই সংসার গড়েছে বহু পরিবার । এখানে দুটি বাচ্চা মেয়ে থাকে আমার খুব প্রিয় দুইজন । একজনের নাম পাখি আর অপরজন মিষ্টি । পাখি বয়সে ছোট , ওর একটা ভাইও রয়েছে , নাম ভবা । ভবা প্রচন্ড দুষ্টু , এই পুরো রাস্তা জুড়ে ওর সাম্রাজ্য ও খেলে , ও দৌড়ায় , যা ইচ্ছা তাই করে । অবশ্য তা খুবই সাধারণ বাচ্চারা বদমাইশি করবে এটাই তো স্বাভাবিক। আর পাখি, সে তো সব পড়া পারে , নিজের আনন্দে ওর চলা ফেরা , আর তেমনি নাকের ডোগায় রাগ । মিষ্টি ওর থেকে দুবছরের বড় হলেও কোনো পার্থক্য নেই , যেন দুই বন্ধু সমান , বরং যে বড় সেই যেন অতিরিক্ত অবুঝ । রোজ যাওয়া আসার সময় ওদের সঙ্গে দেখা হয় । ভালো লাগে । মনে হয় আমাদের বৃদ্ধ ঘরে যে শৈশব যার রেশ আর মাত্র আর বাকি নেই তাই এসে জায়গা করে নিয়েছে এই ফুটপাতে ।বাচ্চারা আমাদের শৈশব বহন করে নাকি ? কি জানি হয়তো হবে । তবে ভালো লাগে । এসবই আমার নৈঃশব্দ্যের অংশ । তবে হৃদয়পুরের প্রধান প্রাণকেন্দ্র এসব পেরিয়ে দিদার চায়ের দোকান ।
সহজ হাসির স্থির চোখ , আর স্পষ্ট ঝাঁঝালো কিন্তু মনের ভিতরের যে সন্তান স্নেহের ঝর্ণা বয়ে চলেছে তার জল বয়ে ভেসে আসা সেই কথা । এই বেঞ্চ এটাইতো আমার সেই নৈঃশব্দ এখানে বসেই কত কবিতা কত আলাপ , ব্যস্ততা এড়িয়ে এইখানেই তো চলে আসা , নিজের মতো বসে বই পড়া । মানুষ দেখা তাদের প্রতিদিনের জীবন থেকে যে সোনা উঠে আসে তা উপভোগ করা , তাদের প্রতিদিনের যন্ত্রণা এড়িয়ে বুক ভরে হেসে ওঠা । আবার এখানে এসেই প্রশ্ন জাগে আমাদের কি নৈঃশব্দ্যের কোনো জায়াগা হয় সত্যিই ? নাকি তা কোলাহল সম্পর্কে সামহিক অসচেতনতা, আবার নৈঃশব্দ্যের মধ্যেও তো শব্দ থাকে , সে শব্দ আসলে কেমন ? জীবনের সমস্যা গুলোকে বাদ দিয়েই হয়তো নির্মিত তার স্বরূপ ,এ হয়তো কিছুটা পলায়ন , এইটুকুই । এই যে দিদা সারাদিন কাজ করছেন , তিনি কি নৈঃশব্দ্য জানেন ? হয়তো জানেন কঠিন শব্দে না হোক , তবে জানেন , নিজেকে সময় দেওয়ার কথা তার-ও মনে জাগে । কিন্তু এখন তো কাজের সময় , দোকানে থাকলে তার চিন্তা থাকে অন্য , পরেরদিনের চিন্তা সেই যাপনের চিন্তা যার কাঠিন্য এড়াতেই হয়তো এখানে এসেছি , অন্ন সংস্থানের চিন্তা । নিজেকে নিয়ে খারাপ লাগে , এই বেঁচে থাকা নিয়ে , কত কিছু করা বাকি মনে হয় । আমাদের সকলের জীবনেই হয়তো এই খারাপ লাগার জায়গাটা আসে , তখন এই দিদার মতো মানুষ গুলো নৈঃশব্দ্যের নতুন সংজ্ঞা লিখে যান । দিদাও কেমন মায়ের মতো টাকা না থাকলে নিজে জিজ্ঞাসা করে খাওয়ান , বাড়ি ফেরার সময় জিজ্ঞাসা করে টাকা আছে ? না থাকলে তাও দেন। আমার কেমন যেন লাগে মানুষটাকে , বা এরম মানুষ গুলোকে । যাই হোক ফিরে আসি , দিদার চায়ের দোকান , ছোট্ট , বালিগঞ্জ ব্রিজের নিচে একটুকরো জায়গা , কিভাবে বহন করে চলেছে সমস্ত কোলাহল এড়িয়ে একটুকরো ভালোবাসার আঙিনা তা ভাবলে অবাক হই । চা নিই । দূরে একটা গান বাজছে স্পষ্ট শুনতে পারছি না , কেবল সুর ভেসে আসছে , এ চত্তরে নানান রকমের গান বাজে। গানটা কানে আসতে থাকে আমি চা-টা শেষ করি । মৃদু বৃষ্টি শুরু হয়েছে ভালো লাগছে । কবিতার খাতাটা বার করে দিদার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকি । দোকানের বেঁচা-কেনা মধ্যে মানুষটা নিজের জন্য কতটুকু সময় পান , তবু বৃদ্ধ বয়স অসুস্থ শরীর কিছুই তাকে থামতে দেয়নি । মানুষের বাঁচার চাহিদা তাকে থামতে দেয়না । যাক অনেক হলো ‘এবার উঠি বুঝলে ’ বলে উঠি । একটা জীবন নিমেষে কেঁটে যায় সত্যি , তবে তার মধ্যে এই যে অনন্ত সব মুহূর্ত, সেই মুহূর্তে আমাদের অবস্থান ও মুহূর্তের প্রতি সাড়া দেওয়া , এবং সেসবের স্মৃতি , তাই তো রয়ে যায় এই বেঞ্চে , এই ঘরদোর জুড়ে । বৃষ্টি থেমে আকাশটাও পরিষ্কার হচ্ছে , একটা কবিতা মাথার মধ্যে ঘুরছে । দিদাকে নিয়ে একটা কবিতা । যাই তাড়াতাড়ি । বাড়ি ফিরেই লিখে ফেলতে হবে । ঘরে এক ছোট্ট মেয়ে বসে আছে । আর একটা ভবিষ্যত আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোলাহলের মাঝে নৈঃশব্দ্য টুকুর জন্য ।
অমিত দে
শ্রাবণ , ১৪২৯
Comments
Post a Comment